টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার দক্ষিণাঞ্চলের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা। এছাড়া চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। টানা তিনদিন পানিবন্দি থাকলেও অনেক দুর্গত মানুষ সরকারি বা বেসরকারি কোনো ত্রাণ সহায়তা পাননি।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে, কেউ উঁচু ভবনে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শুক্রবার রাতের ভারী বৃষ্টির পর শনিবার সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। পরে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্রাণ সংকটের বিষয়টি আলোচনায় এলে সরকার, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করে।
দেশের অন্যান্য দুর্যোগে চট্টগ্রামের মানুষ যেভাবে অন্যদের পাশে দাঁড়ান, এবার নিজেদের দুর্যোগে পর্যাপ্ত ত্রাণ না পেয়ে তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি সহায়তা কম হওয়ায় অনেক দুর্গত মানুষের মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার সকালে বাঁশখালীর বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। একই দিন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাতকানিয়ার ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকা পরিদর্শন করে ৮০০ পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণ বিতরণ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম।
চট্টগ্রামে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের অনুরোধে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা জেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় অনুসন্ধান, উদ্ধার এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর দুর্গম এলাকায় নৌকাযোগে চাল, চিড়া, মুড়ি, বিশুদ্ধ পানিসহ জরুরি খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে সাতকানিয়ার বিভিন্ন প্লাবিত ইউনিয়নে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়। কোমর থেকে বুকসমান পানিতে তলিয়ে থাকা এলাকায় নৌকাই এখন মানুষের একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।
স্থানীয় বাসিন্দা আমির হোসেন জানান, কয়েকদিন ধরে ঘরবন্দি থাকায় অনেক পরিবার খাদ্যসংকটে ভুগছিল। সেনাবাহিনীর ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোয় তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, বিজিবি, আনসার এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।
শনিবার সকাল থেকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলও দুর্গম এলাকায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে। বাঁশখালীর কাথারিয়া-বরইতলী এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী নাজিম উদ্দীন ছোটন বলেন, অনেক ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে অন্তত খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বাহারছড়ার বাসিন্দা নুর আনোয়ার জানান, প্রথম দুইদিন কেউ না এলেও এখন বিভিন্ন সংগঠন খাদ্যসামগ্রী নিয়ে পৌঁছাচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বন্যা পরিস্থিতি তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, প্রশাসনের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড, বিজিবি, আনসার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো মানুষ ত্রাণ থেকে বঞ্চিত না হন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকার ও জেলা প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে। উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।