আমি স্বপ্নে দেখছি, আব্বু আমাকে কোলে নিয়ে বলে—আইসক্রিম খাবি? আমি বলি, হ্যাঁ। তারপর আব্বু বলে—সাইকেল লাগবে? আমি বলি, হ্যাঁ। আব্বু আমাকে একটা সাইকেল কিনে দিয়েছিল। সেই সাইকেল চালাইছি। এখন সাইকেলও দেখি না, আর আমার আব্বুকেও দেখি না।’
ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিল ৫ বছর বয়সী সাজিদুল ইসলাম। জুলাই আন্দোলনে শহীদ বাবা মিজানুর রহমানকে হারানোর পর বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে ছোট্ট এই শিশু।
রাতে ঘুমের মধ্যেও বাবাকে স্বপ্নে দেখে সাজিদুল। বাবার ভালোবাসা আর স্নেহের স্মৃতি এখন তার একমাত্র ভরসা। বাবার কবর থেকে মাটি এনে বোতলে ভরে বালিশের নিচে রেখে ঘুমায় সে। তার বিশ্বাস, ওই মাটির মধ্যে এখনো বাবার গন্ধ আছে।
শহীদ মিজানুর রহমানের বাবা জাকির হোসেন দুলাল বলেন, “ছেলে হারানোর কষ্ট একমাত্র যে হারিয়েছে, সেই বুঝতে পারে। মিজানুর আমার বড় ছেলে ছিল। সংসারের সব দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ২০ জুলাই গুলিতে তাকে হারাতে হয়েছে।”
তিনি জানান, ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলের মরদেহ দেখার পর ২১ জুলাই বরগুনার গ্রামের বাড়িতে এনে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জাকির হোসেন বলেন, “নাতি প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করে—দাদু ভাই, আমার বাবা কি ঘুম থেকে উঠবে না? বাবা কি বাড়িতে আসবে না?”
২০২৪ সালের ২০ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকার মানিকনগর বিশ্বরোড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মিজানুর রহমান। তিনি বরগুনা সদর উপজেলার কালিরতবক এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
জীবিকার তাগিদে প্রায় ১০ বছর আগে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন মিজানুর। সেখানে বিভিন্ন কাজ করলেও বেশিরভাগ সময় বাবার সঙ্গে ঠেলাগাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি।
ঘটনার দিন সকালে স্ত্রী, সন্তান ও বাবাকে বাসায় রেখে কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন মিজানুর। বিকেলে কাজ শেষে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরে তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
দুই বছর পরও মিজানুরের পরিবারে শোকের ছায়া কাটেনি। ৯ বছর বয়সী মেয়ে সামিয়া আক্তার পিংকি এখনো বাবার স্মৃতি ভুলতে পারেনি। আর ৫ বছরের সাজিদুল প্রতিদিন বাবাকে ফিরে পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করে।
মিজানুরের স্ত্রী জাকিয়া আক্তার শিরিন বলেন, “বাবা ছাড়া সন্তান মানুষ করা খুব কঠিন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকি। একটি স্থায়ী কর্মসংস্থান ও থাকার ব্যবস্থা হলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।”
পরিবার জানায়, সরকার থেকে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকার সহযোগিতা পেয়েছেন তারা। তবে এখনো স্থায়ী আবাসন ও কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবারটি।
ছেলে হারানোর কষ্টে এখনো কাঁদেন মিজানুরের বাবা-মা। তাদের একটাই দাবি—শহীদ মিজানুরের সন্তানদের ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ হয়।
ছোট্ট সাজিদুলের চোখে আজও একটাই অপেক্ষা—
“আমার আব্বু কি আর কোনোদিন বাড়ি আসবে না?”