শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ ঢাকা   
বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ

ফেনীতে গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: সিসিটিভি, সুরতহাল ও চিরকুট ঘিরে বাড়ছে রহস্য



ফেনীতে গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: সিসিটিভি, সুরতহাল ও চিরকুট ঘিরে বাড়ছে রহস্য

ফেনীর পরশুরামে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ফারহানা আক্তার প্রিয়া (১৬) নামে এক কিশোরীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় একের পর এক নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। মৃত্যুর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এটি আত্মহত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা নাকি অন্য কোনো অপরাধ—তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

গত ২৩ জুলাই পরশুরাম উপজেলা গেটসংলগ্ন কাদের টাওয়ারের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে প্রিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার সেবারহাট এলাকার মৃত সাইফুল ইসলাম ও ফারজানা আক্তারের মেয়ে। প্রায় চার বছর ধরে তিনি কেতরাঙ্গা মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা জাহেদা আক্তার তিমুর বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করছিলেন।

ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন তাকে পরশুরামের দক্ষিণ তালবাড়িয়ার একটি সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবারের কেউ উপস্থিত না থাকায় মায়ের সম্মতিতে গৃহকর্তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে মিলল নতুন তথ্য

ঘটনার পর গৃহকর্ত্রী দাবি করেছিলেন, তিনি বাসার দরজায় তালা দিয়ে যাননি। কিন্তু ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনি সকাল ৮টা ২৪ মিনিটে ফ্ল্যাটের দরজায় তালা লাগিয়ে চাবি নিজের ব্যাগে রেখে বিদ্যালয়ে যান।

এছাড়া সকাল ৬টা ৪৯ মিনিটে প্রিয়াকে কিছু হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হতে এবং প্রায় পাঁচ মিনিট পর আবার ফিরে আসতে দেখা যায়। এরপর তাকে আর বাইরে বের হতে দেখা যায়নি।

বিকেল ৫টা ১ মিনিটে গৃহকর্ত্রী ফিরে এসে তালা খোলার চেষ্টা করেন। পরে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় কেয়ারটেকারের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে প্রিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান বলে দাবি করেন।

সুরতহাল প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নানা তথ্য

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—

  • সিলিং ফ্যান থেকে মেঝের দূরত্ব প্রায় ৮ ফুট
  • মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা প্রায় ৯ ফুট
  • গলার ফাঁসের গিঁট ফ্যান থেকে প্রায় ৩০ ইঞ্চি নিচে
  • প্রিয়ার পা মেঝে থেকে প্রায় ১০ ইঞ্চি ওপরে ছিল
  • শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি

তবে ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট, 'Love' আকৃতির একটি লোহার পাত এবং অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়েছে।

চিরকুটে ইংরেজি অক্ষরে "I", তার নিচে "K+P", এবং সর্বশেষে বাংলা ভাষায় "করেছি" লেখা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া মরদেহের নিচে রক্তের ফোঁটা পাওয়া যায়, যা প্রাথমিকভাবে ঋতুস্রাবজনিত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। বাম হাতে দুটি কাটা দাগও পাওয়া গেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ।

প্রতিবেশীদের অভিযোগ

ভবনের কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, ঘটনার আগের রাতে গৃহকর্ত্রী ও প্রিয়ার মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। কেউ কেউ মারধরের অভিযোগও তুলেছেন। যদিও এসব অভিযোগ এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

স্বজনদের অভিযোগ

প্রিয়ার খালা মনোয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, প্রায় চার বছর গৃহকর্মীর কাজ করলেও পরিবারের হাতে কোনো বেতন পৌঁছায়নি। মৃত্যুর পর থানায় বসে চার বছরের পারিশ্রমিক বাবদ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা তাদের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রিয়াকে লেখাপড়া করানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কখনো স্কুলে ভর্তি করানো হয়নি। উদ্ধার হওয়া চিরকুটের লেখাও প্রিয়ার নিজের কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

পুলিশ কী বলছে?

পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম জানান, আত্মহত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা কিংবা অন্য কোনো অপরাধ—সব দিক বিবেচনায় রেখেই তদন্ত চলছে।

তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ একসঙ্গে পর্যালোচনা করেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে।

স্থানীয়দেরও দাবি, পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক।

বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ফেনীতে গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: সিসিটিভি, সুরতহাল ও চিরকুট ঘিরে বাড়ছে রহস্য

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

ফেনীর পরশুরামে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ফারহানা আক্তার প্রিয়া (১৬) নামে এক কিশোরীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় একের পর এক নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। মৃত্যুর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এটি আত্মহত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা নাকি অন্য কোনো অপরাধ—তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

গত ২৩ জুলাই পরশুরাম উপজেলা গেটসংলগ্ন কাদের টাওয়ারের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে প্রিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার সেবারহাট এলাকার মৃত সাইফুল ইসলাম ও ফারজানা আক্তারের মেয়ে। প্রায় চার বছর ধরে তিনি কেতরাঙ্গা মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা জাহেদা আক্তার তিমুর বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করছিলেন।

ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন তাকে পরশুরামের দক্ষিণ তালবাড়িয়ার একটি সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবারের কেউ উপস্থিত না থাকায় মায়ের সম্মতিতে গৃহকর্তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে মিলল নতুন তথ্য

ঘটনার পর গৃহকর্ত্রী দাবি করেছিলেন, তিনি বাসার দরজায় তালা দিয়ে যাননি। কিন্তু ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনি সকাল ৮টা ২৪ মিনিটে ফ্ল্যাটের দরজায় তালা লাগিয়ে চাবি নিজের ব্যাগে রেখে বিদ্যালয়ে যান।

এছাড়া সকাল ৬টা ৪৯ মিনিটে প্রিয়াকে কিছু হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হতে এবং প্রায় পাঁচ মিনিট পর আবার ফিরে আসতে দেখা যায়। এরপর তাকে আর বাইরে বের হতে দেখা যায়নি।

বিকেল ৫টা ১ মিনিটে গৃহকর্ত্রী ফিরে এসে তালা খোলার চেষ্টা করেন। পরে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় কেয়ারটেকারের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে প্রিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান বলে দাবি করেন।

সুরতহাল প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নানা তথ্য

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—

  • সিলিং ফ্যান থেকে মেঝের দূরত্ব প্রায় ৮ ফুট
  • মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা প্রায় ৯ ফুট
  • গলার ফাঁসের গিঁট ফ্যান থেকে প্রায় ৩০ ইঞ্চি নিচে
  • প্রিয়ার পা মেঝে থেকে প্রায় ১০ ইঞ্চি ওপরে ছিল
  • শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি

তবে ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট, 'Love' আকৃতির একটি লোহার পাত এবং অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়েছে।

চিরকুটে ইংরেজি অক্ষরে "I", তার নিচে "K+P", এবং সর্বশেষে বাংলা ভাষায় "করেছি" লেখা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া মরদেহের নিচে রক্তের ফোঁটা পাওয়া যায়, যা প্রাথমিকভাবে ঋতুস্রাবজনিত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। বাম হাতে দুটি কাটা দাগও পাওয়া গেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ।

প্রতিবেশীদের অভিযোগ

ভবনের কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, ঘটনার আগের রাতে গৃহকর্ত্রী ও প্রিয়ার মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। কেউ কেউ মারধরের অভিযোগও তুলেছেন। যদিও এসব অভিযোগ এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

স্বজনদের অভিযোগ

প্রিয়ার খালা মনোয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, প্রায় চার বছর গৃহকর্মীর কাজ করলেও পরিবারের হাতে কোনো বেতন পৌঁছায়নি। মৃত্যুর পর থানায় বসে চার বছরের পারিশ্রমিক বাবদ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা তাদের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রিয়াকে লেখাপড়া করানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কখনো স্কুলে ভর্তি করানো হয়নি। উদ্ধার হওয়া চিরকুটের লেখাও প্রিয়ার নিজের কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

পুলিশ কী বলছে?

পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম জানান, আত্মহত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা কিংবা অন্য কোনো অপরাধ—সব দিক বিবেচনায় রেখেই তদন্ত চলছে।

তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ একসঙ্গে পর্যালোচনা করেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে।

স্থানীয়দেরও দাবি, পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক।


বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ



কপিরাইট © ২০২৬ বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ফেনীতে গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: সিসিটিভি, সুরতহাল ও চিরকুট ঘিরে বাড়ছে রহস্য
0:00 0:00
1.0x