বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ ঢাকা   
বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ
Topic Ads 1
সব সরকারি চাকরিজীবী পাবেন মোবাইল ভাতা, পেনশনে বড় পরিবর্তন

সব সরকারি চাকরিজীবী পাবেন মোবাইল ভাতা, পেনশনে বড় পরিবর্তন

নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন। এত দিন নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ সুবিধা পেতেন। একই সঙ্গে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের নিট পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে নতুন বেতন কাঠামোর সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। রোববার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পর এসব তথ্য জানা গেছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। নতুন স্কেলটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। সবার জন্য মোবাইল ভাতা নতুন বেতন কাঠামোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের একটি হলো মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো। নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী ১ম থেকে ২০তম-সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এ ভাতা পাবেন। এত দিন ৫ম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে ই-মেইল, অনলাইন সভা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কাজ বাড়ায় প্রায় সব পর্যায়ের কর্মচারীকেই ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে। কম পেনশন যাদের, বাড়বে তাদের বেশি নতুন বেতন কাঠামোয় পুরোনো পেনশনারদের জন্যও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র‌্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) এখনই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পেনশন বাড়ানোর নতুন ফর্মুলা অনুমোদন করা হয়েছে। এতে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি হারে সুবিধা পাবেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী— ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন হলে বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬৫ শতাংশ। ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬০ শতাংশ। ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি হলে বাড়বে ৫৫ শতাংশ। ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসর নেওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা এ সিদ্ধান্তে বেশি সুবিধা পাবেন। মূল বেতন বাড়বে তিন ধাপে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সরকারের হিসাবে, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন আগের তুলনায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে। তবে পুরো বেতন বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অন্যতম কারণ একসঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা। প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা নতুন বেতনস্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অতিরিক্ত পরিচর্যা ও পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উপকৃত হবেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন ব্যবস্থার সুবিধা পাবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না গ্রাহক

তিন বছর পূর্ণ করেছে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি। শুরু থেকেই আস্থাহীনতা, বিতর্ক ও বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির কারণে নানা বাধার মুখে পড়ে সরকারের এই উদ্যোগ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কর্মসূচিটি আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। তবে পরবর্তী সরকার কর্মসূচি চালু রাখার পাশাপাশি এর আওতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হলেও প্রত্যাশিত হারে গ্রাহক বাড়েনি।২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। ওই দিন থেকেই বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘প্রগতি’, স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য ‘সুরক্ষা’, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাসী’ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘সমতা’—এই চারটি স্কিম চালু করা হয়।উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কর্মসূচিতে কার্যত স্থবিরতা দেখা দেয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৩ হাজারে।এরপরও নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ার গতি ছিল ধীর। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরের বেশি সময়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার নতুন গ্রাহক যুক্ত হন। পরবর্তী সাড়ে তিন মাসে আরও দেড় হাজারের বেশি মানুষ যুক্ত হয়েছেন। ফলে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৬০ জনে।এসব গ্রাহক মোট ২৮১ কোটি ৫০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে তহবিলের ৩০৭ কোটি টাকার কিছু বেশি সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।কেন আস্থা হারিয়েছেন গ্রাহকেরারাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেক গ্রাহক কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেন। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম জানান, আর্থিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি ও তাঁর স্ত্রী ‘প্রগতি’ স্কিমে নিবন্ধন করেছিলেন। দুজনই মাসে ২ হাজার টাকা করে চাঁদা জমা দিতেন। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তারা আর কিস্তি দেননি।কিছু গ্রাহকের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র এবং ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের তুলনায় সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির আর্থিক সুবিধা কম মনে হওয়ায় কিস্তি বন্ধ করার কথা জানা গেছে।অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, যথাযথ প্রস্তুতি ও বিশ্লেষণ ছাড়াই কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। ফলে চাঁদা ও পেনশন সুবিধার কাঠামো নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে পেনশন নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে তারা মনে করেন।সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগজাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আস্থাহীনতার কারণে অনেক গ্রাহক কিস্তি দেওয়া বন্ধ করেছিলেন। তবে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বেসরকারি খাতের কর্মীদের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পেনশন ফান্ড’ গঠনের অঙ্গীকার রয়েছে।এ কারণে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় থাকা বেসরকারি কর্মীদের অবসরের সময় জমাকৃত অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে দেওয়াসহ বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।কর্মসূচিকে আরও গতিশীল করতে এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ২২৭ কোটি টাকা সহজশর্তের ঋণে ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। দ্রুত ডিপিপি প্রণয়ন করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর কথা রয়েছে।সরকারি চাকরিজীবীদেরও আনার পরিকল্পনাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখনো সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।এ বিষয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন সুবিধা দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত সময়ে তা কার্যকর করা হবে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনা। এখন পর্যন্ত পাওয়া সাড়া বিবেচনায় এই লক্ষ্য অর্জনে আশাবাদী কর্তৃপক্ষ।

কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না গ্রাহক