ঢাকার এক কোণে অবস্থিত মেরাদিয়া। একসময় নদী-খাল আর গ্রামীণ পরিবেশে ঘেরা এই অঞ্চল ছিল অনেকটাই নিভৃত জনপদ। সময়ের সঙ্গে মেরাদিয়ার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠে বনশ্রী আবাসিক এলাকা। বিশেষ করে বনশ্রী অ্যাভিনিউর ১, ২, ৩, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর সড়ক এবং রামপুরা-স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন এলাকায় এখন আধুনিক নগরজীবনের ছোঁয়া।
তবে এই পরিবর্তনের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। মেরাদিয়া বাজারের ইতিহাস প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো। একসময় বালু নদসংলগ্ন এই হাট ছিল বেশ জমজমাট। নদীপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা শাকসবজি, মাছসহ নানা গৃহস্থালি পণ্য নিয়ে আসতেন এখানে।
গত দেড় দশকে বনশ্রী ও মেরাদিয়া এলাকায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। আবাসিক এলাকার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে শপিং, খাবার, বিনোদন ও জীবনযাপনকেন্দ্রিক নানা প্রতিষ্ঠান।
কেনাকাটার নতুন কেন্দ্র
বনশ্রী অ্যাভিনিউ ৮ এখন কেনাকাটার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এখানে রয়েছে দেশের অন্যতম পরিচিত ফ্যাশন হাউস আড়ং। পাশাপাশি এই সড়কে শোরুম গড়ে তুলেছে ক্ল্যাসিক্যাল সোল, টুয়েলভ ক্লদিং, আনজার, ইলিয়েন ও আমব্রেলার মতো বিভিন্ন লাইফস্টাইল ও পোশাকের ব্র্যান্ড।
রূপচর্চার জন্যও গড়ে উঠেছে বেশ কিছু পারলার।
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণী সফুরা আফরিন বলেন, আড়ং বা ইলিয়েনের মতো ফ্যাশন ব্র্যান্ডের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান ও ক্রয়ক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে। একই এলাকায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুম থাকায় কেনাকাটার সময় ও পরিশ্রম দুটোই কমে।
এলাকার কয়েকটি ভবনে নতুন করে রং করার কাজও দেখা গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্লাবহাউসসহ কয়েকটি ব্র্যান্ড সেখানে নতুন স্টোর চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফিটনেস ও বিনোদনের জায়গা
বনশ্রীর ১ ও ৩ নম্বর সড়কের কাছাকাছি রয়েছে বনশ্রী প্লেগ্রাউন্ড। শিশুদের খেলাধুলার পাশাপাশি প্রাতর্ভ্রমণকারীদের হাঁটার জন্যও এটি ব্যবহৃত হয়।
এর আশপাশে তরুণদের শরীরচর্চার জন্য রয়েছে স্ট্রং ফিটনেস জিম ও টার্ফ রিপাবলিক। সন্ধ্যার পর টার্ফ রিপাবলিকে তরুণদের সিক্স-আ-সাইড ফুটবল ম্যাচও দেখা যায়। শিশুদের জন্য রয়েছে বাবুল্যান্ডের মতো বিনোদনকেন্দ্র।
সরকারি কর্মকর্তা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যস্ত নগরজীবনে খেলার মাঠ, আধুনিক জিমনেসিয়াম ও শিশুদের বিনোদনের জায়গা অত্যন্ত প্রয়োজন। বনশ্রীর অ্যাভিনিউসংলগ্ন এসব স্পোর্টস হাব ও জিম তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে ভূমিকা রাখছে।
ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজার ও মেরাদিয়ার হাট
বনশ্রী অ্যাভিনিউ ৮ ও রামপুরা-স্টাফ কোয়ার্টার সড়কসংলগ্ন কাঁচাবাজারের পরিচিতি বনশ্রী ও আশপাশের এলাকাজুড়ে। প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তাজা শাকসবজি, মাছ, মাংস ও গৃহস্থালি পণ্যের জন্যও বাজারটির বেশ সুনাম রয়েছে।
বিশেষ করে প্রতি বুধবার এখানে বসে ঐতিহ্যবাহী মেরাদিয়ার হাট।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ডি এম রুম্মান বলেন, তিনি নিয়মিত এই হাটে কেনাকাটা করতে আসেন। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কৃষকেরা শাকসবজি, হাঁস-মুরগি ও মাছ নিয়ে সরাসরি হাটে আসেন। এতে তুলনামূলক কম দামে তাজা পণ্য পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
ভোজনরসিকদের নতুন গন্তব্য
শুধু কেনাকাটা কিংবা বিনোদন নয়, খাবারের জন্যও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বনশ্রী। রামপুরা খালসংলগ্ন এলাকা থেকে ভূঁইয়াপাড়া মেইন রোড এবং অ্যাভিনিউ ২, ৩, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর সড়কজুড়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন খাবারের দোকান, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ।
এলাকায় রয়েছে আনন্দ বেকারি, টেস্টি ট্রিট, মিঠাই, পুষ্টি ডেইরি, কাবুলিওয়ালা, সিপি ফাইভ স্টার, ওয়াফল অ্যান্ড বানস ও লো ডেলিশিয়ার মতো বিভিন্ন খাবারের ব্র্যান্ড। পাশাপাশি রয়েছে তেহারি ভাই, মেহেক বিরিয়ানি ও আল্লাহর দান বিরিয়ানি হাউসের মতো খাবারের দোকান।
স্থানীয় এসব খাবারের পাশাপাশি মেক্সিকান, আফগান ও বিভিন্ন বেকারি আইটেমের স্বাদ নিতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তরুণ-তরুণী ও পরিবারগুলোর ভিড় বাড়ে।
তরুণ পেশাজীবী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগে ভালো খাবার খেতে বা প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডা দিতে ধানমন্ডি কিংবা গুলশানের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় যেতে হতো। এখন বনশ্রীতেই বিভিন্ন ধরনের খাবার ও আড্ডার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে।
একসময় নদী-খালঘেরা গ্রামীণ জনপদ মেরাদিয়া এখন আধুনিক আবাসিক এলাকা বনশ্রীর সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে নতুন এক নগরচিত্র। পুরোনো হাটের ঐতিহ্য ধরে রেখেই এখানে যুক্ত হয়েছে ব্র্যান্ডের শোরুম, রেস্তোরাঁ, জিম, খেলার মাঠ ও বিনোদনকেন্দ্র। ফলে মেরাদিয়া-বনশ্রী এখন শুধু বসবাসের এলাকা নয়, বরং ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।