জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাকেদার তৈরি ডেঙ্গুর টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga) ২০২৭ সালের শুরুতে বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে টিকাটি গ্রহণের পর ডেঙ্গু পরীক্ষার ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে টিকা নেওয়ার পর ডেঙ্গু জ্বরের বিভিন্ন পরীক্ষায় ফলাফল পজিটিভ আসতে পারে কি না, সে বিষয়ে রয়েছে আগ্রহ ও উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউডেঙ্গার মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা। ফলে কিছু অ্যান্টিবডিভিত্তিক পরীক্ষার ফল প্রভাবিত হতে পারে, তবে সক্রিয় সংক্রমণ শনাক্তের পরীক্ষাগুলো সাধারণত টিকার কারণে ভুল ফল দেখানোর কথা নয়।
কীভাবে কাজ করে কিউডেঙ্গা?
কিউডেঙ্গা একটি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড বা দুর্বলীকৃত ভাইরাসভিত্তিক টিকা। এতে ডেঙ্গুর চারটি ধরন—ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ এবং ডিইএনভি-৪—এর বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপাদান থাকে।
টিকা গ্রহণের পর শরীর ডেঙ্গু ভাইরাসকে চিনতে শেখে এবং অ্যান্টিবডি ও টি-সেল তৈরি করে। এর ফলে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি ও জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ডেঙ্গু শনাক্তে কোন পরীক্ষা করা হয়?
ডেঙ্গু নির্ণয়ের ক্ষেত্রে রোগীর উপসর্গ, অসুস্থতার সময়কাল এবং বিভিন্ন পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত ব্যবহৃত পরীক্ষাগুলো হলো—
- এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা: সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে ভাইরাসের এনএস১ প্রোটিন শনাক্ত করা হয়।
- আরটি-পিসিআর পরীক্ষা: রক্তে ডেঙ্গু ভাইরাসের জেনেটিক উপাদান বা আরএনএ শনাক্ত করা হয়।
- আইজিএম পরীক্ষা: সাম্প্রতিক সংক্রমণের ফলে তৈরি অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা হয়।
- আইজিজি পরীক্ষা: পূর্ববর্তী সংক্রমণ বা টিকার মাধ্যমে তৈরি প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা হয়।
কোন পরীক্ষায় প্রভাব পড়তে পারে?
গবেষণায় দেখা গেছে, কিউডেঙ্গা টিকা নেওয়ার পর অনেকের শরীরে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আইজিজি অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ফলে আইজিজি পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসতে পারে, যদিও ব্যক্তির সক্রিয় ডেঙ্গু সংক্রমণ নাও থাকতে পারে।
এ কারণে শুধু আইজিজি পরীক্ষার ফল দেখে ডেঙ্গু হয়েছে কি না, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। রোগীর টিকা নেওয়ার ইতিহাসও বিবেচনায় নিতে হবে।
এনএস১ ও পিসিআর পরীক্ষায় কি ভুল ফল আসবে?
এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা বা আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় কিউডেঙ্গার কারণে মিথ্যা পজিটিভ ফল পাওয়ার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ নেই।
কারণ, এসব পরীক্ষা মূলত শরীরে সক্রিয় ভাইরাস বা ভাইরাসের নির্দিষ্ট উপাদান শনাক্ত করে। টিকার কারণে তৈরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা সাধারণত এই পরীক্ষাগুলোর ফলকে প্রভাবিত করে না।
আইজিএম পরীক্ষার ক্ষেত্রে কী হবে?
আইজিএম পরীক্ষা সাম্প্রতিক সংক্রমণের প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। টিকা নেওয়ার পর এর ফল কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা রোগীর উপসর্গ, সময়কাল এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
টিকা নেওয়ার পর কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?
টিকা নেওয়ার পর হালকা জ্বর, ব্যথা বা অস্বস্তির মতো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তবে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- উচ্চ জ্বর
- তীব্র মাথাব্যথা
- বারবার বমি
- পেটে ব্যথা
- রক্তপাতের লক্ষণ
- গুরুতর ডেঙ্গুর উপসর্গ
পরীক্ষা করার আগে কী জানাবেন?
ডেঙ্গুর পরীক্ষা করানোর আগে চিকিৎসককে অবশ্যই জানাতে হবে—
- সম্প্রতি ডেঙ্গুর টিকা নেওয়া হয়েছে কি না;
- কোন ধরনের পরীক্ষা সবচেয়ে উপযুক্ত হতে পারে;
- অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফল টিকার কারণে প্রভাবিত হতে পারে কি না;
- প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা প্রয়োজন হবে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউডেঙ্গা টিকা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরিতে সহায়তা করলেও কিছু অ্যান্টিবডিভিত্তিক পরীক্ষার ফল পরিবর্তিত হতে পারে। তবে সক্রিয় সংক্রমণ শনাক্তে ব্যবহৃত এনএস১ ও পিসিআর পরীক্ষার ফল সাধারণত টিকার কারণে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই ডেঙ্গু পরীক্ষার সময় টিকা নেওয়ার তথ্য চিকিৎসককে জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।