মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ ঢাকা   
বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ

দোকানি নেই, মানুষকে বিশ্বাস করেই ৪ বছর ধরে চলছে যে দোকান


ডেক্স রিপোর্ট
ডেক্স রিপোর্ট

দোকানি নেই, মানুষকে বিশ্বাস করেই ৪ বছর ধরে চলছে যে দোকান
হরিণাকুণ্ডুর চারাতলা বাজারে বিক্রেতা ছাড়াই চলে এই দোকান। ছবি: আজকের পত্রিকা

দোকানের ঝাঁপ খোলা। সামনে সাজানো চা, পান, বিস্কুট, কেকসহ নানা পণ্য। পাশে চুলার ওপর চায়ের কেটলি। দোকানে প্রয়োজনীয় সবকিছু থাকলেও নেই কোনো দোকানি। চা খেতে বা পণ্য কিনতে আসা মানুষই এখানে ক্রেতা, আবার তাঁরাই বিক্রেতা। নিজের হাতে চা বানিয়ে খাচ্ছেন, পণ্য নিচ্ছেন এবং দাম হিসাব করে ক্যাশবাক্সে রেখে চলে যাচ্ছেন। কেউ প্রয়োজন হলে বাকিও নিচ্ছেন, পরে এসে পরিশোধ করছেন।

এভাবেই ব্যতিক্রমী এই দোকানটি চলছে টানা চার বছর ধরে। দোকানটির অবস্থান ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোকানে বসে কয়েক কাপ চা তৈরি করছেন বৃদ্ধ হারুনুর রশিদ। পাশে বেঞ্চে বসে আছেন আরও কয়েকজন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, তিনিই দোকানি। তবে কিছুক্ষণ পর বোঝা গেল, তিনিও অন্যদের মতোই একজন ক্রেতা। নিজের জন্য চা বানানোর পাশাপাশি সঙ্গে থাকা অন্যদের জন্যও চা তৈরি করছেন তিনি। চা পান শেষে প্রত্যেকে নিজের বিল হিসাব করে টাকা রেখে চলে যাচ্ছেন।

হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দোকানে বেশির ভাগ সময় বিক্রেতা থাকেন না। চা খেতে ইচ্ছা করলে এসে নিজেই বানিয়ে নিই। সঙ্গে কেউ থাকলে তার জন্যও বানিয়ে দিই। খাওয়া শেষে যত টাকা বিল হয়, দোকানে রেখে চলে যাই। এই দোকানে কেউ কাউকে পাহারা দেয় না। কিন্তু সবাই নিজের দায়িত্ব বুঝে নেয়।’

শুধু হারুনুর রশিদ নন, দোকানে আসা প্রায় সব ক্রেতাই একই নিয়ম মেনে চলেন। আফাঙ্গীর হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘যাঁর যখন প্রয়োজন, তখন তিনিই দোকানদার। পণ্য নিয়ে বা চা খেয়ে দাম রেখে চলে যাচ্ছেন। টাকা না থাকলে পরে এসে পরিশোধ করছেন। চার বছর ধরে এভাবেই চলছে। পণ্য নিয়ে দাম না দেওয়ার ঘটনা সাধারণত ঘটে না। মানুষের সততার ওপরই দোকানটি চলছে।’

মানুষের ওপর বিশ্বাস রেখেই শুরু

এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন পাশের ভালকি গ্রামের মৃত মুরাদ আলী মণ্ডলের ছেলে সমসের আলী। তিনিই দোকানটির মালিক।

প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে চা, বিস্কুট, কেকসহ প্রয়োজনীয় পণ্য সাজিয়ে রাখেন তিনি। চুলায় কেটলি বসিয়ে আগুন জ্বালিয়ে নিজের অন্য কাজে চলে যান। সময় পেলে দুপুরে এসে দোকানের অবস্থা দেখে যান। রাতে ফিরে সারা দিনের বেচাকেনার হিসাব মিলিয়ে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরেন।

সমসের আলী জানান, একসময় তিনি চারাতলা বাজারে অনেকটা সময় কাটাতেন। তখন অন্যের দোকানে বসে না থেকে নিজেই একটি দোকান দেওয়ার চিন্তা করেন। কিন্তু অন্য ব্যবসার কারণে সারাক্ষণ দোকানে বসে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কর্মচারী রাখার সামর্থ্য বা ইচ্ছাও ছিল না। শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপর আস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সমসের আলী বলেন, ‘সকালে এসে দোকান খুলে পণ্য সাজিয়ে রাখি। চুলা জ্বেলে দিয়ে চলে যাই। যার যখন প্রয়োজন হয়, নিজের মতো করে চা-পান বানিয়ে খান। প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা লাভ হয়। মানুষের সততার ওপর ভরসা রেখেই দোকানটি চলছে। মানুষের ওপর এতটা ভরসা করেও কখনো ঠকতে হয়নি।’

বিশ্বাস আর সততার গল্প

সদর উপজেলার সাধুহাটি এলাকা থেকে চারাতলা বাজারে বেড়াতে আসা আব্দুল খালেকও দোকানটির এই ব্যবস্থা দেখে বিস্মিত। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা খুবই বিরল। মানুষের প্রতি দোকানির বিশ্বাস আর মানুষের সততা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মানুষ সৎ হলে জীবন কত সহজ আর সুন্দর হতে পারে, এখানে এসে সেটাই বুঝলাম।’

চার বছর ধরে দোকানটি চলছে কোনো পাহারাদার বা বিক্রেতা ছাড়াই। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, বসছে মানুষের আড্ডা; আর প্রতিদিনের লেনদেনে নীরবে টিকে আছে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সততার এক ব্যতিক্রমী গল্প।

বিষয় : জেলার খবর ঝিনাইদহ খুলনা বিভাগ দোকান হরিণাকুণ্ডু ঝিনাইদহ সদর বাজার

বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬


দোকানি নেই, মানুষকে বিশ্বাস করেই ৪ বছর ধরে চলছে যে দোকান

প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দোকানের ঝাঁপ খোলা। সামনে সাজানো চা, পান, বিস্কুট, কেকসহ নানা পণ্য। পাশে চুলার ওপর চায়ের কেটলি। দোকানে প্রয়োজনীয় সবকিছু থাকলেও নেই কোনো দোকানি। চা খেতে বা পণ্য কিনতে আসা মানুষই এখানে ক্রেতা, আবার তাঁরাই বিক্রেতা। নিজের হাতে চা বানিয়ে খাচ্ছেন, পণ্য নিচ্ছেন এবং দাম হিসাব করে ক্যাশবাক্সে রেখে চলে যাচ্ছেন। কেউ প্রয়োজন হলে বাকিও নিচ্ছেন, পরে এসে পরিশোধ করছেন।

এভাবেই ব্যতিক্রমী এই দোকানটি চলছে টানা চার বছর ধরে। দোকানটির অবস্থান ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোকানে বসে কয়েক কাপ চা তৈরি করছেন বৃদ্ধ হারুনুর রশিদ। পাশে বেঞ্চে বসে আছেন আরও কয়েকজন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, তিনিই দোকানি। তবে কিছুক্ষণ পর বোঝা গেল, তিনিও অন্যদের মতোই একজন ক্রেতা। নিজের জন্য চা বানানোর পাশাপাশি সঙ্গে থাকা অন্যদের জন্যও চা তৈরি করছেন তিনি। চা পান শেষে প্রত্যেকে নিজের বিল হিসাব করে টাকা রেখে চলে যাচ্ছেন।

হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দোকানে বেশির ভাগ সময় বিক্রেতা থাকেন না। চা খেতে ইচ্ছা করলে এসে নিজেই বানিয়ে নিই। সঙ্গে কেউ থাকলে তার জন্যও বানিয়ে দিই। খাওয়া শেষে যত টাকা বিল হয়, দোকানে রেখে চলে যাই। এই দোকানে কেউ কাউকে পাহারা দেয় না। কিন্তু সবাই নিজের দায়িত্ব বুঝে নেয়।’

শুধু হারুনুর রশিদ নন, দোকানে আসা প্রায় সব ক্রেতাই একই নিয়ম মেনে চলেন। আফাঙ্গীর হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘যাঁর যখন প্রয়োজন, তখন তিনিই দোকানদার। পণ্য নিয়ে বা চা খেয়ে দাম রেখে চলে যাচ্ছেন। টাকা না থাকলে পরে এসে পরিশোধ করছেন। চার বছর ধরে এভাবেই চলছে। পণ্য নিয়ে দাম না দেওয়ার ঘটনা সাধারণত ঘটে না। মানুষের সততার ওপরই দোকানটি চলছে।’

মানুষের ওপর বিশ্বাস রেখেই শুরু

এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন পাশের ভালকি গ্রামের মৃত মুরাদ আলী মণ্ডলের ছেলে সমসের আলী। তিনিই দোকানটির মালিক।

প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে চা, বিস্কুট, কেকসহ প্রয়োজনীয় পণ্য সাজিয়ে রাখেন তিনি। চুলায় কেটলি বসিয়ে আগুন জ্বালিয়ে নিজের অন্য কাজে চলে যান। সময় পেলে দুপুরে এসে দোকানের অবস্থা দেখে যান। রাতে ফিরে সারা দিনের বেচাকেনার হিসাব মিলিয়ে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরেন।

সমসের আলী জানান, একসময় তিনি চারাতলা বাজারে অনেকটা সময় কাটাতেন। তখন অন্যের দোকানে বসে না থেকে নিজেই একটি দোকান দেওয়ার চিন্তা করেন। কিন্তু অন্য ব্যবসার কারণে সারাক্ষণ দোকানে বসে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কর্মচারী রাখার সামর্থ্য বা ইচ্ছাও ছিল না। শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপর আস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সমসের আলী বলেন, ‘সকালে এসে দোকান খুলে পণ্য সাজিয়ে রাখি। চুলা জ্বেলে দিয়ে চলে যাই। যার যখন প্রয়োজন হয়, নিজের মতো করে চা-পান বানিয়ে খান। প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা লাভ হয়। মানুষের সততার ওপর ভরসা রেখেই দোকানটি চলছে। মানুষের ওপর এতটা ভরসা করেও কখনো ঠকতে হয়নি।’

বিশ্বাস আর সততার গল্প

সদর উপজেলার সাধুহাটি এলাকা থেকে চারাতলা বাজারে বেড়াতে আসা আব্দুল খালেকও দোকানটির এই ব্যবস্থা দেখে বিস্মিত। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা খুবই বিরল। মানুষের প্রতি দোকানির বিশ্বাস আর মানুষের সততা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মানুষ সৎ হলে জীবন কত সহজ আর সুন্দর হতে পারে, এখানে এসে সেটাই বুঝলাম।’

চার বছর ধরে দোকানটি চলছে কোনো পাহারাদার বা বিক্রেতা ছাড়াই। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, বসছে মানুষের আড্ডা; আর প্রতিদিনের লেনদেনে নীরবে টিকে আছে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সততার এক ব্যতিক্রমী গল্প।


বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ



কপিরাইট © ২০২৬ বনশ্রী নিউজ (Banasree News) | সত্যের সন্ধানে প্রতিক্ষণ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
দোকানি নেই, মানুষকে বিশ্বাস করেই ৪ বছর ধরে চলছে যে দোকান
0:00 0:00
1.0x